অরণ্যের আহ্বান! পশ্চিমবঙ্গের বন্যপ্রাণী সাফারি—প্রকৃতির কোলে এক রোমাঞ্চকর যাত্রা
যদি কখনও মনে প্রশ্ন জাগে—‘বন্যপ্রাণী সাফারি কি?’—তবে সহজ ভাষায় বললে, এটি এমন এক যাত্রা যেখানে আপনি প্রকৃতির গহীনে গিয়ে বন্যপ্রাণীদের তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে দেখতে পারবেন। এখানে কাঁচের খাঁচা নেই, দেওয়াল নেই—শুধু আপনাকে ঘিরে থাকবে প্রকৃতির বিস্ময়! পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা জঙ্গল ও সংরক্ষিত উদ্যানগুলিতে রয়েছে একাধিক পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত বন্যপ্রাণী সাফারি, যেখানে জঙ্গলের প্রাণীরা অবাধে বিচরণ করে, আর আপনি হয়ে উঠতে পারেন এই রহস্যময় অরণ্যের এক ক্ষণিক অতিথি।
আর ‘বেঙ্গল সাফারির বিশেষত্ব’? এই সাফারির সৌন্দর্য ঠিক যেন এক রোমাঞ্চকর কবিতা! এখানে আপনি দেখতে পাবেন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আত্মবিশ্বাসী পদচারণা, হাতির উদাসীন গতিবিধি, চিতল হরিণের দুরন্ত দৌড়, আর গহীন সবুজের মাঝে এক স্বপ্নময় অভিজ্ঞতা। মনে হবে, আপনি যেন সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে চলে এসেছেন এক অনন্য জগতে, যেখানে কেবল প্রকৃতিরই রাজত্ব!
প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যেতে ভালোবাসেন? তাহলে চলুন, একসঙ্গে ঘুরে আসি পশ্চিমবঙ্গের সেরা বন্যপ্রাণী সাফারিগুলি থেকে!
পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত বন্যপ্রাণী সাফারি—অরণ্যের বিস্ময় এক অনবদ্য যাত্রা
পশ্চিমবঙ্গ, তার অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁচলে জড়িয়ে রেখেছে এক অভূতপূর্ব অরণ্যজগত। এই মাটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বনভূমির অমোঘ রহস্য, বুনো প্রকৃতির অসীম বৈচিত্র্য, আর বন্যপ্রাণের অবাধ গতি। যাদের হৃদয়ের গহীনে প্রকৃতির জন্য এক অদম্য টান, তাদের জন্য পশ্চিমবঙ্গের বন্যপ্রাণী সাফারিগুলো নিছক একটি পর্যটনস্থল নয়, বরং এক অনির্বচনীয় অনুভূতির জন্মভূমি। আসুন, একবার ডুব দিই সেই বিস্ময়কর জগতে, যেখানে প্রকৃতি নিজেই আমাদের পথপ্রদর্শক।
বেঙ্গল সাফারি, শিলিগুড়ি—অরণ্যের হৃদয়ে এক রোমাঞ্চকর সফর
তরাই অঞ্চলের স্নিগ্ধ ছায়ায় লুকিয়ে থাকা ‘বেঙ্গল সাফারি’ পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় বন্যপ্রাণী সাফারি। ঘন শাল, সেগুন ও কদমগাছের মাঝে তৈরি এই সাফারি যেন প্রকৃতির এক প্রাণবন্ত ক্যানভাস, যেখানে বাঘের চঞ্চল পদধ্বনি, হাতির অবিচল গতি, আর হরিণের সতর্ক দৃষ্টি মিলে এক আশ্চর্য পরিবেশ তৈরি করে।
- জিপ সাফারি: জঙ্গলের সরু পথ ধরে যখন জিপ এগিয়ে চলে, তখন বাতাসে মিশে থাকে বুনো মাটির সোঁদা গন্ধ, দূরে কোথাও হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে একপাল ময়ূর। হঠাৎ যদি ঘন পল্লবের আড়াল থেকে দেখা মেলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের, তখন হৃদস্পন্দন মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। এই সাফারির প্রতিটি বাঁক যেন এক অজানা গল্পের নতুন অধ্যায়।
- এলিফ্যান্ট সাফারি: হাতির পিঠে বসে যখন প্রকৃতির গভীরে প্রবেশ করা হয়, তখন অনুভব করা যায় প্রকৃতির আদিম স্পন্দন। এলিফ্যান্ট সাফারির মাধ্যমে আপনি জঙ্গলের সেই সব পথ ধরতে পারেন, যেখানে গাড়ি যেতে পারে না, আর সেখানেই অপেক্ষা করে প্রকৃতির অলিখিত কবিতা।
- নেচার ট্রেইল: পায়ে হেঁটে জঙ্গলের সৌন্দর্য উপলব্ধি করার মধ্যে রয়েছে এক অন্যরকম মাধুর্য। গাছের ডালে দোল খায় লাজুক হনুমান, পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট অচেনা পাখিরা, আর জঙ্গলের বাতাসে মিশে থাকে এক অদ্ভুত রহস্য।

সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ—ম্যানগ্রোভের গহীনে বাঘের রাজত্ব
যেখানে গাছের শেকড় মাটির বদলে জলে মেলে ধরে, যেখানে নদীর বুকে জঙ্গলের ছায়া পড়ে, সেই অপূর্ব ভূমিই সুন্দরবন। এখানকার বাঘেরা কেবল শাসক নয়, বরং এক কিংবদন্তি। গা ছমছমে নীরবতার মাঝে বনের গভীরে যখন নৌকা ভেসে চলে, তখন মনে হয় যেন এক রূপকথার দেশে প্রবেশ করা হল।
- বোট সাফারি: সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী সাফারির বিশেষত্ব হল এর জলপথের সাফারি। ছোট্ট কাঠের নৌকায় চেপে গহীন জলপথ ধরে এগিয়ে গেলে কখন যে চোখের সামনে এক বিশালাকায় রয়েল বেঙ্গল টাইগার জল খেতে চলে আসবে, তা বলা কঠিন।
- কুমির ও হরিণ দর্শন: শুধুমাত্র বাঘ নয়, সুন্দরবন তার বুকের মাঝে লুকিয়ে রেখেছে বড়সড় কুমির, লোনা জলের কচ্ছপ আর অসংখ্য চিত্রা হরিণের পাল। ম্যানগ্রোভের শেকড়ের মাঝে কখনও উঁকি দেয় বিশাল গাঙ্গেয় ডলফিন, যা এক বিরল অভিজ্ঞতা।
জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান—সিংহল গন্ডারের গহীন ঠিকানা
ডুয়ার্সের সবুজের বুকে লুকিয়ে থাকা জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান এক অনন্য অভয়ারণ্য। এখানেই দেখা মেলে ভারতের অন্যতম বিরল প্রাণী, একশৃঙ্গ গন্ডার।
- এলিফ্যান্ট সাফারি: জলদাপাড়ায় গন্ডার দেখা মানেই হাতির পিঠে চেপে যাওয়া। গ্রীষ্মের দুপুরে যখন বিশাল গন্ডারটি জলাশয়ের ধারে বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন একান্তে দাঁড়িয়ে তার রাজকীয় উপস্থিতি অনুভব করার মধ্যে রয়েছে এক অপার্থিব আনন্দ।
- জিপ সাফারি: হাতির পাশাপাশি এখানে জিপ সাফারির ব্যবস্থাও রয়েছে, যেখানে গহীন ঘাসবন আর ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আপনি এক অবিস্মরণীয় যাত্রায় যেতে পারেন।

গরুমারা জাতীয় উদ্যান—হাতির পথ ধরে প্রকৃতির রাজ্যে
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ গরুমারা জাতীয় উদ্যান পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম দর্শনীয় বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য।
- গন্ডার ও বাইসন: এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো বিশালাকৃতির ভারতীয় বাইসন ও একশৃঙ্গ গন্ডার, যারা গহীন অরণ্যে অবাধে বিচরণ করে।
- নদীর ধারে বনজীবন: জঙ্গল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট নদীগুলি যেন প্রাণ জুড়ানো দৃশ্য তৈরি করে, যেখানে হাতির পাল এসে জল পান করে, আর হরিণেরা জলের ধারে খেলা করে।
বক্সা টাইগার রিজার্ভ—প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য
বক্সা ফরেস্ট শুধুমাত্র বন্যপ্রাণীর জন্য নয়, এর নৈসর্গিক সৌন্দর্যও পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
- রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিতা: এখানে মাঝে মাঝে চিতারও দেখা মেলে, যা বাংলার অন্য কোনও জঙ্গলে খুব একটা দেখা যায় না।
- ঐতিহাসিক দুর্গ ও পাহাড়ি বন: এখানকার বনভূমি শুধুমাত্র বন্যপ্রাণীর জন্য বিখ্যাত নয়, বক্সা ফোর্টের ধ্বংসাবশেষের জন্যও এটি জনপ্রিয়। একদিকে ইতিহাস, অন্যদিকে প্রকৃতি—এক অনন্য সংমিশ্রণ।
![]()
